পল্টনে স্কুলে শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল। নির্যাতনকারী খোদ স্কুলের প্রিন্সিপাল ও তার স্বামী।
রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘শারমিন একাডেমি’-তে এক শিশুশিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিও প্রকাশের পরপরই প্রতিষ্ঠানটিতে তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একাডেমির দায়িত্বশীলদের ব্যবহৃত সব যোগাযোগ নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আনুমানিক ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী এক শিশুকে স্কুল ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় টানা-হেঁচড়ে একটি অফিস কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক পুরুষ শিক্ষক শিশুটিকে বেধড়ক মারধর করেন। ওই সময় পাশে বসে থাকা এক নারী শিক্ষক শিশুটির হাত চেপে ধরে রাখেন। একাধিকবার শিশুটিকে ভয়ভীতি, ধমক ও শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়। পুরো ঘটনায় শিশুটিকে চরম আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দেখা যায়।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে রোববার (১৮ জানুয়ারি) দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে। ভিডিওটি প্রথম প্রকাশ করেন আইনজীবী সালেহ উদ্দিন, যিনি বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুর ১টার দিকে ফেসবুকে ফুটেজটি পোস্ট করেন। এরপরই ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
প্রাথমিকভাবে শনাক্ত নির্যাতনকারীরা হলেন— শারমিন একাডেমির পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক শারমিন জাহান এবং একই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার পবিত্র কুমার বড়ুয়া।
জানা গেছে, তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। শারমিন জাহান তার প্রথম স্বামীর সঙ্গে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করতেন। প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি নিজ নামে ‘শারমিন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, গোলাপি রঙের শাড়ি পরিহিত ওই নারী শিক্ষক শিশুটিকে বারবার চড় মারছেন এবং কড়া ভাষায় ধমক দিচ্ছেন। একপর্যায়ে পুরুষ শিক্ষক শিশুটির দিকে স্ট্যাপলার হাতে এগিয়ে এসে মুখে স্ট্যাপল লাগানোর হুমকি দেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ভিডিওর কিছু অংশে ওই নারীকে হাসিমুখে (স্মার্ক করতে) দেখা যায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক নিন্দার জন্ম দিয়েছে।
ভিডিওর শেষাংশে আরও দুই নারীকে কক্ষে উঁকি দিতে দেখা যায়। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে নির্যাতনকারীরা সাময়িকভাবে আচরণ বন্ধ করেন।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ঘটনাটি তদন্তে নেয়। পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল খান বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। যাচাই-বাছাই করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, ঘটনাটি নয়াপল্টনের শারমিন একাডেমিতেই ঘটেছে। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের থানায় আসার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তবে তারা সময়ক্ষেপণ করছে।”
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষককে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে মতিঝিল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার হুসাইন মো. ফারাবি জানান, পুলিশ ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তিনি বলেন, “পরিবার লিখিত অভিযোগ বা এফআইআর দিলে সঙ্গে সঙ্গে মামলা রুজু করা হবে।” তবে এখনো পরিবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দিতে রাজি হয়নি বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিনে শারমিন একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের মূল ফটকে তালা ঝুলছে। ভেতরে নেই কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক। পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ ফাঁকা। কেয়ারটেকার কামরুল হক জানান, আগের দিন পর্যন্ত স্কুল খোলা থাকলেও হঠাৎ করেই কর্তৃপক্ষ কাউকে কিছু না জানিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে।
ঘটনার পর অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, স্কুলকে যেখানে শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ভাবা হয়, সেখানে এমন বর্বর নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
শিশুঅধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু আইন ২০১৩, জাতীয় শিশু নীতি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধরনের ঘটনা শিশুদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা তৈরি করে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল না হলে অধিকাংশ শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশই পায় না। তাই দ্রুত আইনি পদক্ষেপ ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
>> পল্টনে স্কুলে শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল, স্কুলে তালা, লাপাত্তা কর্তৃপক্ষ
আরও পড়ুন বাংলাদেশ | ব্যবসা বাণিজ্য | রাজনীতি | বিনোদন






