৪৪ বছরের যাত্রার ইতি: বন্ধ হল এমটিভি ও তাদের একাধিক মিউজিক চ্যানেল
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫—এই তারিখে শেষবারের মতো নীরব হলো এমটিভি। শুধু একটি টেলিভিশন চ্যানেল নয়, থেমে গেল একটি সময়, একটি ভাষা, একটি প্রজন্মের যৌথ স্মৃতি।
এমটিভির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট গ্লোবালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বছরের শেষ রাতে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এমটিভি হিটস, এমটিভি ৮০স, এমটিভি ৯০স, এমটিভি জিরো জিরোজসহ একাধিক মিউজিক চ্যানেলের সম্প্রচার। এর মধ্য দিয়ে ১৯৮১ সালে শুরু হওয়া এমটিভি’র ৪৪ বছরের মিউজিক টেলিভিশন যাত্রার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।
যে পর্দা একদিন গান শোনার নিয়ম বদলে দিয়েছিল, নতুন শিল্পী চিনিয়েছিল, ফ্যাশন, ভাবনা আর বিদ্রোহের মানচিত্র এঁকেছিল—সেই এমটিভি আজ বিদায়ের পথে। স্ট্রিমিং ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে গান ঘর বদলেছে। সেই পরিবর্তনের ভারেই ধীরে ধীরে ফিকে হয়েছে মিউজিক টেলিভিশনের আলো। তবু যারা রাত জেগে প্রিয় ভিডিওর অপেক্ষা করেছে, কাউন্টডাউনের শেষ মুহূর্তে শ্বাস আটকে রেখেছে—তাদের কাছে এটি শুধু একটি চ্যানেল বন্ধ হওয়া নয়, এটি এক যুগের ইতি।
‘আই ওয়ান্ট মাই এমটিভি’ থেকে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব
১৯৮১ সালে ‘আই ওয়ান্ট মাই এমটিভি (I Want My MTV)’—এই স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এমটিভি। তখন গান শুধু শোনা হতো। এমটিভি শিখিয়েছিল, গান দেখতেও হয়।
মিউজিক ভিডিও হয়ে উঠল অপরিহার্য, শিল্পীর ভিজ্যুয়াল পরিচয় পেল সুরের সমান গুরুত্ব। পপ কালচার পেল এক বৈশ্বিক মঞ্চ—যেখানে রক, র্যাপ, হিপ-হপ, অ্যাসিড হাউস একই ভাষায় কথা বলত।
এমটিভি খুব দ্রুতই ‘কুল’-এর প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে। নতুন ট্রেন্ড, নতুন সাবকালচার, তরুণদের আত্মপরিচয়ের আয়না হয়ে দাঁড়ায় এই চ্যানেল। স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে এমটিভি তুলে ধরেছিল ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গীত—একটি বৈশ্বিক যুবসমাজের জন্ম দিয়েছিল তারা।
যুদ্ধের মাঝেও সংস্কৃতির জানালা
ইউরোপে এমটিভির উত্থান ঘটে সমাজতান্ত্রিক শাসনের পতনের সময়। পূর্ব ইউরোপের তরুণদের কাছে পশ্চিমা সংস্কৃতি ছিল দূরের স্বপ্ন—এমটিভি ছিল সেই স্বপ্নের প্রথম স্পর্শ। একটি জানালা, যেখান দিয়ে ঢুকেছিল স্বাধীনতার বাতাস।
যে সারায়েভো একদিন বিশ্বমঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, সেখানেই বড় ব্যান্ডের লাইভ পারফরম্যান্স সম্প্রচার—এমটিভিই তা সম্ভব করেছিল।
১৯৯২ সালে সারায়েভো অবরোধ শুরু হলে এমটিভির সামনে আসে ভিন্ন এক দায়িত্ব। তারা রাজনীতি নয়, মানুষের গল্প বলেছিল। গোলার শব্দের ভেতরেও যে জীবন থেমে যায়নি—সেই জীবনের গল্প।
এমটিভি নিউজ দেখিয়েছিল অবরুদ্ধ শহরের প্রতিরোধ, তরুণদের সাহস, সংস্কৃতির লড়াই। অবরোধের মধ্যেই অনুষ্ঠিত সারায়েভো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ভিএইচএস টেপে আসা সিনেমা—সবই জায়গা পেয়েছিল এমটিভির পর্দায়।
ইউটু ও ব্রায়ান ইনের সঙ্গে লুচিয়ানো পাভারোত্তির কণ্ঠে গাওয়া ‘মিস সারায়েভো’ শুধু গান ছিল না—ছিল এক আর্তনাদ।
১৯৯৩ সালে অবরুদ্ধ সারায়েভোর তরুণীরা হাতে লেখা ব্যানারে লিখেছিল, “ ডোন্ট লেট দেম কিল আস! (Don’t let them kill us!)”। এমটিভিই সেই ছবি, সেই গল্প ছড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্বজুড়ে।
রাজনীতি যা পারেনি, সঙ্গীত এক মুহূর্তের জন্য হলেও তা পেরেছিল—মানুষকে চোখে চোখ রেখে সত্য দেখাতে।
কেন বন্ধ হলো এমটিভি’র মিউজিক চ্যানেল
এমটিভির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান প্যারামাউন্ট গ্লোবাল জানিয়েছে, দর্শকসংখ্যা হ্রাস, বিজ্ঞাপন আয়ের ঘাটতি এবং ডিজিটাল কনজাম্পশন প্যাটার্ন বদলে যাওয়াই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ।
বর্তমানে দর্শকরা টেলিভিশনের বদলে ইউটিউব, স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিকের মতো অন-ডিমান্ড প্ল্যাটফর্মে অভ্যস্ত। পাশাপাশি, সংস্থাটি তাদের স্ট্রিমিং সার্ভিস ‘প্যারামাউন্ট প্লাস’-এ বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
একটি বৃত্তের সমাপ্তি
পরে এমটিভি বদলেছে—রিয়্যালিটি শো, বাণিজ্যিক কনটেন্ট এসেছে। তবু তার উত্তরাধিকার মুছে যায়নি। ২০২৫ সালের শেষে মিউজিক চ্যানেলগুলো বন্ধ হওয়া মানে একটি বৃত্তের সমাপ্তি—যেখানে সঙ্গীত ছিল বৈশ্বিক প্রজন্মের কেন্দ্রীয় ভাষা।
বিশেষ করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মতো দেশের জন্য এই বিদায় আরও ভারী। সেখানে এমটিভি শুধু বিনোদন ছিল না—ছিল প্রমাণ যে যুদ্ধের মাঝেও সংস্কৃতি বেঁচে থাকতে পারে।
আজ অ্যালগরিদম আর অন্তহীন প্লে লিস্টের দুনিয়ায় সেই যৌথ অভিজ্ঞতা প্রায় হারিয়ে গেছে। তাই এমটিভির বিদায় মানে শুধু একটি চ্যানেল বন্ধ হওয়া নয়—এটি সেই অধ্যায়ের শেষ, যেখানে গান শহর, দেশ আর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারত—যুদ্ধের মাঝেও।






